দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা: ক্ষতিকর অভ্যাস, অপকারিতা ও মুক্তির কার্যকর উপায়
বর্তমান সময়ে দেরীতে ঘুমানো এবং দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা যেন অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, কাজের চাপ কিংবা অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে আমরা অনেকেই সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে দেরি করি। কিন্তু এই অভ্যাসটি ধীরে ধীরে আমাদের শরীর, মন এবং আত্মিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এই লেখায় আমরা জানব—দেরীতে ঘুম থেকে উঠলে কী হয়, এর ক্ষতিকর দিকগুলো কী এবং কীভাবে এই অভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। পাশাপাশি থাকছে ঘুমানোর আগে ও ঘুম থেকে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ দোয়া।
দেরীতে ঘুম থেকে উঠলে কী হয়?
দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা শুধু অলসতার বিষয় নয়, এটি একটি অস্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইলের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস চলতে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি (Biological Clock) বিঘ্নিত হয়।
এর ফলে শরীর ঠিকমতো কাজ করতে পারে না এবং দিনের শুরুতেই ক্লান্তি অনুভূত হয়।
দেরীতে ঘুম থেকে ওঠার অপকারিতা
১. শারীরিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি
সকালের সময় শরীর সবচেয়ে ফ্রেশ থাকে। দেরীতে ঘুম থেকে উঠলে সেই প্রাকৃতিক এনার্জি মিস হয়। ফলে সারাদিন অলসতা, মাথা ভারী ভাব ও কাজের অনীহা দেখা দেয়।
২. হজমের সমস্যা ও ওজন বৃদ্ধি
দেরীতে উঠলে সকালের খাবার ঠিকমতো হয় না, যার ফলে হজমে সমস্যা হয়। এছাড়া অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া ও কম শারীরিক কার্যকলাপের কারণে ওজন বাড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৩. মনোযোগ ও কাজের দক্ষতা কমে যাওয়া
যারা দেরীতে ঘুম থেকে ওঠেন, তাদের মধ্যে মনোযোগের ঘাটতি বেশি দেখা যায়। পড়াশোনা, অফিসের কাজ কিংবা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে।
৪. মানসিক চাপ ও হতাশা
দেরীতে ওঠার কারণে অনেক কাজ জমে যায়, সময়ের চাপ বাড়ে। এতে ধীরে ধীরে মানসিক অস্থিরতা, বিরক্তি ও হতাশা তৈরি হয়।
৫. ধর্মীয় ক্ষতি
ফজরের নামাজ কাজা হওয়া দেরীতে ঘুম থেকে ওঠার সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ইসলামে সকাল বেলার সময়কে অত্যন্ত বরকতময় বলা হয়েছে, যা দেরীতে ওঠার কারণে নষ্ট হয়ে যায়।
দেরীতে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস কীভাবে বাদ দেবেন?
১. নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করুন
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন। রাত ১০:৩০–১১টার মধ্যে ঘুমালে শরীর স্বাভাবিকভাবে সকালে উঠতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
২. ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার কমান
ঘুমানোর অন্তত ৩০–৬০ মিনিট আগে মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করুন। নীল আলো ঘুমের হরমোন (Melatonin) কমিয়ে দেয়।
৩. ফজরের নিয়তে ঘুমান
ঘুমানোর আগে মনে দৃঢ় নিয়ত করুন—ফজরের নামাজের জন্য উঠবেন। নিয়ত মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখে।
৪. অ্যালার্ম দূরে রাখুন
অ্যালার্ম ঘড়ি বা ফোনটি বিছানা থেকে একটু দূরে রাখুন, যাতে বন্ধ করতে উঠে দাঁড়াতে হয়।
৫. সকালে নিজেকে পুরস্কার দিন
সকালে উঠার পর পছন্দের কিছু কাজ রাখুন—হালকা ব্যায়াম, হাঁটা, কুরআন তিলাওয়াত বা প্রিয় চা। এতে সকালে ওঠার আগ্রহ বাড়বে।
ঘুম থেকে উঠার দোয়া
ঘুম থেকে উঠেই এই দোয়াটি পড়া সুন্নত—
اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
উচ্চারণ:
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আহইয়ানা বা‘দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশূর।
অর্থ:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের মৃত্যুর (ঘুমের) পর পুনরায় জীবন দান করেছেন এবং তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।
ঘুমানোর আগে দোয়া
ঘুমানোর আগে এই দোয়াটি পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ—
بِاسْمِكَ اللّٰهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا
উচ্চারণ:
বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমূতু ওয়া আহইয়া।
অর্থ:
হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মরি (ঘুমাই) এবং জীবিত হই (জাগি)।
উপসংহার
দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা একটি ছোট অভ্যাস মনে হলেও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক হতে পারে। শারীরিক ক্ষতি, মানসিক অস্থিরতা এবং ধর্মীয় দিক থেকে ক্ষতির কথা মাথায় রেখে এখনই এই অভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি।
সঠিক নিয়ত, নিয়মিত রুটিন এবং আল্লাহর সাহায্য চাইলে অবশ্যই এই বদভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
Read more: বাধাকপি খেলে যেসব উপকারিতা পাবেন
0 মন্তব্যসমূহ